সিলেট, ১ সেপ্টেম্বর: সিলেটের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মাদক, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, অবৈধ অস্ত্রসহ বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সতর্কতামূলক ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দেন তিনি।
মঙ্গলবার সিলেট সার্কিট হাউজে জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও উন্নয়ন নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব নির্দেশ দেন। সভায় বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সিলেটের বালু, পাথর ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ আহরণসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান, আদালতের রায় এবং দেশের প্রয়োজন—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে গঠিত জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা মনিটরিং করতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় সংস্থার সমন্বয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সিলেটের বালু-পাথর ব্যবসার সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। একই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করাও জরুরি। তাই পরিবেশ ও জনস্বার্থের মধ্যে সমন্বয় করে এ বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যা ও নদীভাঙনসহ সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন ঝুঁকি সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
মাদক প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাদকের কারণে সমাজে নানা ধরনের অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয় সৃষ্টি হচ্ছে। মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও জোরদারের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা এবং জনসচেতনতা সৃষ্টিতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
চাঁদাবাজির ক্ষেত্রেও কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাজনৈতিক দল বা সরকারের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করলে তা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সন্ত্রাস ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সরকারের অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এসব অস্ত্র ভবিষ্যতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
লুট হওয়া অস্ত্র, অবৈধ অস্ত্র এবং নির্ধারিত সময়ে জমা না দেওয়া অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি। অবৈধ অস্ত্রের বিষয়ে তথ্য প্রদানকারীদের সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা রয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
পূর্ববর্তী সময়ে বিতর্কিতভাবে দেওয়া অস্ত্রের লাইসেন্স যাচাই-বাছাই করে বাতিল করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এসব লাইসেন্সের আওতায় থাকা অস্ত্র উদ্ধারে মামলা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মব সৃষ্টি বা ‘মব জাস্টিস’-এর বিষয়ে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, দাবি আদায়ের নামে মহাসড়ক বা সড়ক অবরোধ, সরকারি প্রতিষ্ঠান ঘেরাও কিংবা কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, কোনো দাবি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি প্রদান, সংবাদ সম্মেলন, জনসভা, সেমিনারসহ নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তা তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে মব সৃষ্টি বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ না দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোরভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সভায় মাদক নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, সম্প্রতি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) নতুন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে মাদকের শীর্ষ ৫০ ব্যবসায়ীর তালিকা প্রণয়ন করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
খন্দকার মুক্তাদির বলেন, সিলেটে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ও সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা গেলে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব।
মাদকবিরোধী অভিযানসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা ও যানবাহন সরবরাহের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। খন্দকার মুক্তাদির বলেন, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) দেশের অন্যতম বৃহৎ পুলিশি এলাকার দায়িত্ব পালন করছে। তাই তাদের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, আগামীতে এসএমপি, রেঞ্জ পুলিশ ও জেলা পুলিশকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে শুধু অভিযান নয়, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ফলাফল অর্জন করতে হবে।
সভায় সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম এ মালিক, সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আবুল হাসান ও সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমেদসহ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

উৎফল বড়ুয়া :